Sunday, July 29, 2018

একটি চতুর্মাত্রিক প্রেমের গল্প


ব্যাডি, মানে বোধিসত্ত্ব সেন জাতে বদ্যি পেশায় বাজনদার। ও ভালো লাগল না, না? বাজনদার মানে হল গিয়ে ডিজে। রাতের বেলা চোখে চাঁদ চশমা চড়িয়ে, আজে বাজে গানের সাথে ভালো গানের মিশেল পাকিয়ে, মাঝে মাঝে থমকে থামিয়ে এক উদ্ভট ঘণ্ট পাকিয়ে চালায়, আর একগাদা অবোধ, আধমাতাল ছেলেমেয়ে তাতে তাল জ্ঞানহীন জগঝম্প করে খুব মজা পায়।
না না, এসব আমার ভাবনা নয় মোটেই, এরকম ভাবে ব্যাডির একমবেদ্বিতীয়ম বন্ধু দেবদীপ্ত ব্যানার্জী। তা ব্যাডির আজ প্রায় বছর সাত-আটেক হল সুর্য্য দেবের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। উনি সকালে উঠে আলো দিতে বেরোন, ব্যাডি তখন ঘুমায়, ব্যাডি সন্ধ্যেবেলা বেরোয় সুর্য্যদেব তখন পাটে যান। এককথায় ব্যাডি নিশাচর প্রানী, সত্যিই সে রাতে চড়েই বেড়ায়।
এই অবধি ব্যাডির কথা থাক, ব্যাডিতে ফিরব আবার তার আগে বাড়ুজ্জে বামুনের সাথে একটু পরিচয় করেনি। দেবদীপ্ত ব্যানার্জী আজীবন স্কুলের ফার্স্ট বয়, প্রথম সারিতে বসত, ক্লাস নাইনের পর আর মাঠমুখো হয়নি, আইআইটি-র প্রস্তুতি নিয়ে জয়েন্টে দারুণ রেজাল্ট করে এখন সে ভালো চাকুরে ইঞ্জিনিয়ার। এরকম একটি রত্নসম ছেলের সাথে ব্যাডির প্রাণের বন্ধুত্ব হওয়া শাস্ত্রমতে অনুচিত, হতও না যদি না এর পিছনে অন্য কারো অবদান না থাকত।
এইখানে একটু নেপথ্য কাহিনী না বলে নিলে আমার কলম অবধি চুলকোচ্ছে। নেপথ্য কাহিনীর নায়কের নাম চতুর্মুখ, তাঁকে কেউ কোনোদিন দেখেনি কেউ পুজোও করেন না, তিনি একগাদা অপগন্ডকে ঢেলে পৃথিবীতে পাঠিয়ে শান্তিতে আট চোখ বুজে ঝিমুতে পারতেন, কিন্তু বুড়ো বয়স হলে যা হয় আরকি, ওঁরও ভীমরতি হল, কলির তালে নাচলেন চতুর্মুখও।
ব্যাডির বাবা কালাচাঁদ সেন হলেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক, চাইলেই উনি অধ্যাপক হতে পারতেন, তবে মেরুদন্ড সোজা না হলে মাথার পরিচর্যা করে কি হবে এই দর্শনে উনি শিক্ষকতাই বেছে নিলেন। উনি রেজাল্ট দেখে ছাত্র ছাত্রী নেন না। ওঁর কতগুলো নিজস্ব পরীক্ষা আছে পাশ করলে তবেই পড়ান এবং পারিশ্রমিক বাবদ ছাত্র ছাত্রীদের কিছু বই পড়তে বলেন, সেগুলো পড়তেই হয় এটাই নিয়ম। একবার এক ক্লাশ এগারোর ছাত্রকে তার টেস্ট পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়ায় নিজে একটি বই উপহার দিয়েছিলেন, ‘ইন সার্চ অফ শ্রডিঙ্গার’স ক্যাট...’, বড় বড় করে এইটাই নাম ভেবে ছেলেটি ভাবল থ্রিলার বা অ্যাডভেঞ্চারের গপ্পো হবে বুঝি কোনো, কিন্তু পাশে একটা কোলন দিয়ে লেখা ছিল, ‘কোয়ান্টাম পিজিক্স অ্যান্ড রিয়েলিটি’ তা খেয়াল করেনি। কালাচাঁদ বাবু আবার বই দিয়ে পড়া হল কিনা জিজ্ঞাসা করতেন, মাস দুয়েক পর তার বাবা এসে বলেন, তার ছেলে নাকি বিজ্ঞান নিয়ে আর পড়বেনা ঠিক করেছে, এবছরটা বসে গিয়ে সামনের বছর কলা বিভাগে ভর্তি হবে। বিরক্ত বোধ করলে কালাচাঁদ বাবুর নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে ঘোঁত করে একটা শব্দ বেরোয়।
তবে, দেবদীপ্ত অন্য জাতের ছেলে কালাচাঁদ বাবুকে স্কুল কামাই করে আলাদা করে পড়াশুনা করতে হয়, এইরকম প্রশ্নও তার কাছে মজুত থাকত। গাছেরা ত্রিমাত্রিক স্তরের বাইরের স্তর অনুভব করতে পারে কিনা এই নিয়ে একটা উদ্ভট প্রশ্ন করে সে একবার কালাচাঁদ বাবুকে ঘোঁত শব্দ করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এইখানে এইবার একটা সমস্যা এল, সবই ষড়যন্ত্র, নইলে এমন কালাচাঁদ বাবু রুচিস্মিতা নামের আদুরে একটা মেয়েকে তার শুধু একটু ভালো করে পড়াশুনা করতে চাওয়ার ইচ্ছায় বিনা পরীক্ষায় ব্যাচ শুরু হয়ে যাওয়ার আড়াই মাস বাদে ভর্তি নেন? তারপরের মাসদুয়েক ও ভালোই চলেছিল, ব্যাপারটা শুরু হল তৃতীয় মাসের প্রথম শনিবারে।
কি একটা কাজে কালাচাঁদ বাবুকে একটু বেরোতেই হল, বেরোনোর আগে বলে গেলেন, রুচিস্মিতা তুমি দেবদীপ্তর কাছ থেকে পুরোনো পড়া গুলো একটু বুঝে নাও। এইবার আমাদের আবার একটু নেপথ্যে যেতেই হচ্ছে। চতুর্মুখের বয়স গোনা যাবে সে ক্যালকুলেটর তো আবিষ্কার হয়নি এবার ওঁর বয়সের হিসাব কে দেবে? আর একটা বয়সের পর বয়সে গিঁট পড়ে যায় জানেন তো, এই সময়ে শুড্ডাদের ফকরামিতে মন যায়। তিনি ঠিক সেই সময় তীর ধনুক হাতে করে রতিভর্তা কে পাঠালেন অকুস্থলে। মদন দেব বলেছিলেন বার বার যে, ‘দেখুন প্রজাপতি, বিজ্ঞানের ক্লাসে বান ঠিক কাজে আসেনা’। তা ইয়ার্কির সময় কি ফাজলামি ভালো লাগে? চতুর্মুখের-ও লাগেনি।
যে সময়ের কথা হচ্ছে সে সময়ে মোবাইল ফোন এলেও এত রমরমা হয়নি আর দেবদীপ্তর এইসব ফঙ্গবেনে জিনিসে উৎসাহও ছিল না, কিন্তু দু সপ্তাহে রুচিস্মিতার পাশে বসা, তার না বোঝানো বুঝিয়ে দেওয়া ইত্যাদির ফাঁকে তার হৃদি ভেসে গেল পচা গঙ্গার জলে। একদিন ফিজিক্স বই এর ফাঁকে দেবদীপ্ত একটা চিঠি পেল, মানে ঐ দু লাইনের চিরকূট- “একটু কি তাকানো যায়না!” তলায় ছোট্ট করে লেখা ‘আর’। হ্যাঁ দেবদীপ্তর ভাগ্যটা এরকমই ছিল। তা তারপর দেবদীপ্ত বার করলো এই আর-ই হল রুচিস্মিতা। দেবদীপ্ত ছিল জন্মেইছিল সতেরোর ঘরের নামতা মুখস্থ করতে করতে, ও ছিল মেঘনাথ সাহার পুনর্জন্ম, তবু কামিনী কাঞ্চনে কত মুনি ঋষি টলে গেছেন! এরকম সময় যা হয়, ভালো ছেলেরা ইয়ে করলেও ইয়ে করতে পারেনা, তা একজন মুখপাত্র দরকার। সেই হল ব্যাডির আগমন।
তারপর পচা গঙ্গাতেও ফ্লো আসে মাঝে মাঝে, আর যে রাঁধে সে চুল বাধতে পারলেও ‘যে পড়ে সে করেনা’ গুরুবাণী। কিন্তু প্রথম প্রেমের দুঃখ ফাগুনের মনখারাপের মত, স্বয়ং যোগীনাথ কয়েকযুগ মনখারাপ করে কাটিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে দেবদীপ্ত তো, বেচারা! এসব ক্ষেত্রে প্রেম কেটে বাঙ্গালী বন্ধু পায় আর প্রেম হয়ে গেলে বন্ধু বিচ্ছেদ, দেবদীপ্ত আর ব্যাডি বন্ধু হয়ে গেল।

Friday, July 27, 2018

গন্ধ-পুরান



একটা রেস্তোরা লোকেরা খাচ্ছে... একটা লোক নাক তুলে খুব শোঁকার চেষ্টা করছে মুখে নৈরাশ্য
আরেকজনকে ও একটু বাদেই দেখা যায় সেও একই কাজ করছে, মানুষ যারা আছে সব ডি-ফোকাসড
১- পেলি ভাই?
২- নারে, একেবারে যা তা হয়ে গেছে সমাজটা
১- কলিকাল বুঝলি ঘোর কলি, পুরো রসাতলে গেছে
২- শালারা জিম করে না!
১- আরে না না কিসব ডায়েটিং ফায়েটিং হয়েছে না ওইসব কেরদানির ফল
২- যা বলেছিস, বাঙ্গালীর আর কিছু রইল না রে, প্যান্টুলুন পড়ে দেখবি খুলে বেরিয়ে যাবে মনে হয়
১- ট্রেন্ড! তবে দেখনা আমায় যদি একটু পাস...
২- আরে এখানে দেখছিস না কেমন ভিড় আমায় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাছাড়া আজকাল তো লোকের দমের জোর নেই, তোকে মনে হয়...
১- খালি নিজের দিকে ঝোল টানা নারে? দেখছিস তো কিসব শাক পাতা জাবনা কাটছে এখানে আমায় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি না।
২- শাক পাতায় তুই? হাঃ তুই হবি হল গিয়ে আমিষে, মুরগী মটন এইসব হল তোর আস্তানা
১- আর তুই?
২- তা ধর প্রায় আমি প্রায় সর্বত্র বহমান
১- আর আমি বানের জলে ভেসে এসেছি না রে?
২- না না তা কেন হবে, তবে ইদানীং লোকে খায় আধপেটা ঘুমোয় কম তোকে রাখবে কোথায়?
১- তা হলে তোর তো কোনো চান্স-ই নেই রে, বরং ফাঁকা পেট থেকে আমার একটা হাল্কা...
২- নাহ তোকে তো আবার ক্লাসে যেতে হবে দেখছি, তুই পুরো তোর জব ডেসক্রিপশন ভুলে গেছিস।
১- শোন ভাই তোর আর আমার স্ট্যাটাসটা জানিস তো আমি কিন্তু তোর থেকে অনেক বেশি অ্যাক্সেপ্টেড
২- এ তোর সম্পুর্ন ভুল ধারণা, তুই কিন্তু বেসিক্যালি ওয়ান ডাইমেনশনাল
১-আর তুই বুঝি ত্রিমাত্রিক?
২- আচ্ছা আচ্ছা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ভালো না, চারিদিকে দেখছিস না নতুন ক্যাডারে ভরে গেছে
১- হ্যাঁরে ভাই, আমাদের আর সবরা আজে বাজে জায়গায় খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে গেছে
২- তোর ‘ফুরররর’ কে মনে আছে?
১- থাকবে না? তিন স্টেপে বেরোত ও উফ তারপর কি বিস্তার
২- সেসবও দিন ছিল, পোশাক আশাক ও পালটে গেছে একটু জায়গা না পেয়ে চাপতে চাপতে একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়েছি আমরা
১- তারপর ঐ গুপী যন্ত্র খাবে কোথায় মন দিয়ে তা না, দেখ না দেখ ওদিকে...
-হঠাৎ একটা স্যুট বুট পড়া লোক এগিয়ে আসে,
৩- এক্সকিউজ মি, ওটা আমার!
বলে এগিয়ে গিয়ে লোকটার মাথা টিপে ধরে
তার কোটের পিছনে বড় বড় করে লেখা ‘ডিপ্রেশন’
২- ভাই আমরা কি ভুসুক, কুক্কুটদের মত ইতিহাস হয়ে যাব?

ক্যামেরা একটু পিছনে সরে আসে, ১-র পিছনে লেখা ‘ভড়াৎ’ আর ২-এর পিছনে লেখা ‘ফুউস’।

Friday, July 20, 2018

রূপ দেখতে তরাস লাগে..



সে এক দেশে ছিল এক রাজা আর ছিল তার রানী।
এই অবধি আমরা জানি।
রাজার ছিল বহুমূত্র রোগ।
করতে পারত না সুখ ভোগ
ফলত: দুর্ভোগ।
দুর্ভোগ মানে, এত বড় রাজা, যার হাতিশালে হাতি,আর ঘোড়াশালে ঘোড়া, তার বাড়িতে একটা ছেলে পুলে নেই। টাট্টু ঘোড়ায় চড়বে কে? রাজার ভেবেই বহুমূত্র রোগ চাগাড় মারে। 
রাজ্যে শান্তি থাকলেও সুখ নেই, প্রজাদের সকলের মুখে কোষ্ঠ পরিষ্কার না হওয়ার দুঃখ। গ
হাসত শুধু একটা বিড়াল। বিড়ালটা রাজজ্যোতিষীর বাড়িতে থাকত মাঝে মাঝে। রাজ জ্যোতিষী একদিন মাঝরাতে উঠে দেখেন ঘরের মাঝখানে একটা কালো কুচকুচে বেড়াল
ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাসছে। জ্যোতিষী জানতো না বেড়াল কোন দেশে পুজো হয়, তাই বুঝতেও পারেনি কোথা থেকে এল বেড়ালটা। যেই তাড়াতে গেছে, অমনি শোনে, বেড়ালটা বলছে, 'এই যাও'। বুড়ো ভাবল বুঝি ম্যাঁও করেছে ফ্যাঁস করে, কিন্তু কানে যে শুনল ‘যাও’!
কিছুদিন পর বুড়ো দেখে বিড়ালটা অঙ্ক কষছে, কাছে গেলেই বিড়াল যাও বলে তাড়িয়ে দেয়, তাই সে বাহ্যে গেলে জ্যোতিষী দেখে মাটির উপর বিভিন্ন মাপের দাগ কাটা। রাতে জ্যোতিষী বসে কুপি জ্বালিয়ে পুঁথি পড়েন অঙ্ক কষেন মঙ্গলের বক্র গতি, শনির আড়াই প্যাঁচ বুধের ঘরে, বিড়ালও অঙ্ক কষে চোখ জ্বলে তার। কদিন বুড়ো ভাবনায় অস্থির, নাওয়া খাওয়া নেই, বিড়ালটা হাসতে হাসতে বলে উঠল,
‘ক্যাঁও, অহ, অং ইঞা’, বুড়ো শোনে ‘ক্যায়া বাত মেরে এনেছি’, হাসে আর গড়িয়ে পড়ে যায়, আবার অঙ্ক কষে। পড়াশুনা মাথায় উঠল জ্যোতিষীর, রাজবাড়ি যায়না সাত দিন। চুলে যেদিন জট পড়ল সেদিন বিড়াল বলল, ‘ররঙ.. ব্যয়ও... য় র ল ব শ’। বুড়ো তো বিছানায় বসে তিন হাত লাফিয়ে উঠে মাথায় টাক খেয়েছে, বিড়াল বাংলা বলছে, নির্ঘাত নৃসিংহ দেব আবার ছোট করে ফিরে এসেছেন। বুড়ো আরো শুনল বিড়াল বলছে, রাজার বিয়ে, রাজার ছেলে, নতুন রানী, রক্ত গঙ্গা, দেশের মরার হাড়ের হরির লুট। শুনল তবে বুঝল কিচ্ছু না, বিড়াল কথা বলছে এই না কত! বিড়াল আরেকবার কুটিপাটি হেসে, থাবা দিয়ে মাটির অঙ্ক হিজিবিজি করে দিয়ে, বুড়োর আফিমের জলে মুখ দিয়ে বিষম খেয়ে চলে গেল, যাবার আগে যেন বলে গেল ‘আবার আসব’।
পরদিন রাজা লোক পাঠাল জ্যোতিষীকে নিয়ে আসতে। বুড়ো সেদিন মাথার জট ছাড়িয়ে ক্ষউড়ি করে রাজার বাড়িই যাবে ঠিক করেছিল। পথে যেতে যেতে শুনল রাজা শিকারে যাবার দিন জানতে চায়। বিড়ালের কথা কানে বাজে জ্যোতিষীর। পেটের কথা পেটে চেপে রাখে বুড়ো, রাতে হরীতকী ভেজানো জল খায়, বায়ু না হয় যাতে
।
এদিকে রাজা সৈন্য সামন্ত, পাত্র-মিত্র, জগাই-মাধাই, বেয়াই বোনাই নিয়ে চললেন শিকারে। এক জঙ্গল পেরুলেন রাজা, মারলেন একটা বুনোমোষ। সে ব্যাটা বুড়ো হয়ে গেছিল, রাজার ভালোলাগলনা, রাজা পরের জঙ্গলের দিকে এগোলেন। পাত্র-মিত্রদের পেট ব্যাথা করছিল তারা র‍য়ে গেল সেখানেই। পরের জঙ্গলে রাজা মারলেন একটা ভাল্লুক, সে মধু খেয়ে পড়েছিল, রাজার তাও ভালোলাগলনা। আবার হাতঘোড়া সাজল রাজা পরের জঙ্গলে যাবেন। সৈন্য সামন্তদের পায়ে ঝি ঝি ধরে গেল, তারা রয়ে গেল। এবার রাজা চলেন আগে আগে, পিছনে মন্ত্রী আর কোটাল। তৃতীয় জঙ্গলে রাজা একটা হরিণ মারলেন, রাজার তীর গায়ে নিয়ে হরিণ দিল এক ছুট। রাজা হুকুম দিলেন, ‘লে আও বাঁধকে’, কেউ গেলনা! রাজা নিজেই নামলেন ঘোড়া থেকে। জঙ্গলের ভিতর গেলেন অনেকদুর, কোন পথে এসেছিলেন কোন পথে যাবেন গুলিয়ে গেল। রাজা একটা নুয়ে পড়া বড় গাছ ধরে দাঁড়ালেন একটু জিরিয়ে নেবেন বলে, হঠাৎ শোনেন একটা হাল্কা কান্নার আওয়াজ। কেউ কোত্থাও ছিলনা এই একটু আগে পর্যন্ত হঠাৎ কাঁদে কে? তাকিয়ে দেখেন একটা মেয়ে, সুন্দরী বেশ তবে চেহারাটা বেশ বড়সর। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, কে? কি বৃত্তান্ত? এই জঙ্গলে তুমি একা কেন? মেয়ে বলে, বিয়ের রাতে তার স্বামী পিড়িতে বসার আগে মারা গেছে, তার বাড়ির লোকজন তাকে ত্যাগ করেছে, যাবার কোথাও নেই। রাজা শুধালেন, ‘বয়স কত তোমার?’। মেয়েটি চোখের জল মুছে, রাজার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের বয়স বলল। রাজা ভাবলেন, যাকে দেখেনি, শোনেনি সে মরে গেছে কোন রোগে ভুগে তার জন্য বেচারীর কষ্ট! বললেন, ‘নিয়ে যাব তোমায় আমার রাজ্যে, সেখানে আমার রানী আছেন, তুমি থাকবে অন্য মহলে, তোমায় রানীর মতই রাখব। কিন্তু আমার ঘোড়াটা?’ রাজা চিন্তায় পড়লেন। মেয়েটা দুটো খচ্চর জোগার করে এনেদিল।
রাজামশাই দিন তিনেক পরে, খচ্চরের পিঠে চেপে নতুন একটা মেয়েকে নিয়ে রাজ্যে এলেন। ঢাক ঢোল, ঢ্যাঁড়া, বাদ্যি বাজনা, উলু-শঙ্খ কিচ্ছু বাজল না। পুরনো রানী তিন দিন কিছু খেলেন না, তারপর একমাস পর নতুন মেয়েটা রাজার পাশে রাজ দরবারে বসল আর জ্যোতিষীর আবার ডাক পড়ল। রাজা উৎসাহ ভরে জিজ্ঞাসা করলেন গ্রহ তারা নতুন করে কি বলছে? রাজার ছেলে হবে কিনা? নতুন মেয়েটা তার হাত দেখাতে গিয়ে বুড়ো জ্যোতিষীকে হাত দেখাতে গিয়ে নখ দিয়ে চেপে চোখ পাকিয়ে কি যেন বলতে চাইল, বুড়ো দেখল রাজার হাতে জোড়া সন্তান, তবে পুত্রসুখে রাজা বঞ্চিত। জ্যোতিষী গণনার ফল বলে চারটি মুড়ি, বাতাসা আর কলা পেল, খালি শেষ টুকু চেপে গেল।
রাজার ঘরে ছেলে হল, জোড়া ছেলে তবে চোখ পাকানোর ফলে আসল রানীরও ছেলে হল আর নতুন মেয়েটার ছেলের একটু আগেই জন্মালো সে। রানীর ছেলে টুকটুকে ফরসা লাল আপেন যেন, আর মেয়েটার ছেলের রাজার মত মুখের গড়ন তবে রঙটা কালো। নতুন মেয়েটা ছেলেকে কোলে তুলে চোয়াল শক্ত করল। রাজা এলেন প্রহর পেরিয়ে ছোট ছেলেকে দেখতে, দেখে আশীর্বাদ করে চলে গেলেন। কিছুদিন পর নতুন মেয়ের বাপের বাড়ির কিছু লোকেরা রাজ্যে এল, তাদের কারোর কান কুলর মত, কারো চোখ ভাটার মত, কথা বলে চেঁচিয়ে রাজার পাত্র মিত্র তফাৎ গেল।
এদিকে নতুন মেয়েটা একদিন কথা তুলল, সে আসার পরেই রাজা পুত্রমুখ দেখেছেন, তাকে আর রানীর মত করে ফেলে রাখা যাবেনা। নতুন মেয়েরভাইয়ের চেহারা শালগাছের মত, রাজার মুত্রবেগ এল, রাজা রাজি হলেন। রাজ্যে রোজ রাতে কারা যেন খুব জোরে জোরে ফিসফাসে কথা বলে, হাওয়া থম মেরে থাকে, সকালে ঘোড়াশালে একটা ঘোড়া কম পড়ে, কোণে একদলা রক্ত দেখতে পায় সহিস। হাওয়ায় ভুড়ভুড়ি কাটে কিছু কথা, রাজবৈদ্যর ডাক পড়ে রাজবাড়িতে, বৈদ্য জানান রাজার নাড়ি চঞ্চল, ঘৃতকুমারীর রস মাথায় মেখে তিন দিন ফলাহারের নিদান দিয়ে যান। রাতে ফিসফাস বাড়তে থাকে, রাখালের নধর গরুটা খোয়া যায় একদিন, সেদিন রাজদরবার বন্ধ ছিল অনির্দিষ্ট কারণে।
এদিকে সময় গড়িয়ে যায় জ্যোতিষী হিসাব করেন, বৃহস্পতি তুঙ্গী হয়ে কর্কটে আর রাহু মকরে অবস্থান করছে এদিকে শনি মঙ্গল একসাথে রবির ঘরে থাকতে শুরু করেছে। সেই রাতে জ্যোতিষীর ঘুম ভাঙল স্পষ্ট ডাকে, ‘ওঠো হে, সময় তো হয়ে এল’। জ্যোতিষী ধরমরিয়ে উঠে দেখে সেই অঙ্ক কষা বিড়ালটা মুখে একটা ফিচেল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতিষী বলে,’আমার যে চারকুড়ি আয়ু লেখা আছে, সবে তো তিন কাল গেছে তার, কি হবে আমার?’। বিড়াল বলে, ‘মোলো যা, আয়ু নিতে কে এসেছে, শুধু তোমায় নিয়ে যাব, লাগবে তোমায় পরে, গুনে এক কুড়ি সাল কড়ে’। বুড়ো তার পুঁথি টুথি যা ছিল গামছায় বেঁধে বিড়ালের পিছু নিল। বিড়াল বলল, ‘ঘর থেকে বেরিয়ে চোখ আর খুলবে না, যতক্ষণ না বলছি’। বুড়ো চোখ বুজে নিল, চোখ খুলে দেখে এক পাহাড়ের উপর সে আর বিড়াল দাঁড়িয়ে, ভোর হব হব করছে, চারিদিকে একটু শীত শীত ভাব, দূরে একটা সাদা ঘোড়া হলুদ ঘাস চিবোচ্ছে। বেড়ালটা বললে, ‘ঠান্ডা লাগছে বুঝি? আচ্ছা আমি গরম কাপড় পাঠিয়ে দেব, এই নাও ডিম দুখানা রাখো, ঘোড়ার ডিম, আর ঐ পাহাড়ের গুহায় থাকবে, ঘরে সবসময় আগুন জ্বেলে রেখো একটু’। বুড়ো হাঁ করে রইল ডিম দুখানা হাতে নিয়ে। বিড়াল বলল, অত অবাক হওয়ার কিছু হয়নি, ঘোড়ার ডিম জীবনে দেখনি তো কি হয়েছে? পক্ষীরাজ ঘোড়া কখনও দেখেছ? আবার দেখা হবে সময় হলে’, বলে তিন লাফে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল, ঘোড়া অমনি বিশ গজ পাখনা মেলে উড়ে গেল। বুড়োর অবাক হওয়া কমার আগেই শুনতে পেল বিড়ালের গলা, ‘বিশ বছর পর তোমার কাছে আসবে নীলকমল, সে পক্ষীরাজ ঘোড়া চাইতে আসবে’।
     

Thursday, July 19, 2018

একটি পরিকল্পিত হত্যা কাহিনী-৩ (শেষ)


‘পরদিন আমি সময়মত পৌছলাম ঠিকানা অনুযায়ী, বাড়ির সামনে ছোট সুন্দর একটা লাল গাড়ি দাঁড়িয়ে, অ্যাম্বাস্যাডার হবে বা ফিয়াট ও হতে পারে, আমি ঠিক গাড়ির ব্যাপারটা বুঝিনা। বেশ বড় তিন তলা বাড়ি, এক বুড়ো চাকর এসে দরজা খুলে দিল। উপরের একটা ঘর থেকে আওয়াজ এল, ‘বসতে বল দীনুদা, আমার একটু সময় লাগবে’। আমি বসলাম, বড়লোকের বাড়িতে আগে কোনোদিন আসিনি কেমন একটা হতে লাগল, চারিদিকে একটা সুন্দর গন্ধ, খুনটা আসলে কাকে করলে ভালো হয় এরকম একটা চিন্তা চলে আসছিল। হঠাৎ মনে হলো উপর থেকে কেউ যেন সরে গেল, তার মিনিট পাঁচেক পরে এক মহিলা আমায় কাঁচের গ্লাসে জল, কাপ-প্লেটে করে চা আর রকমারি বিস্কুট দিয়ে গেল, খেয়ে নিলাম আমি, ভাবতে গেলে কষ্ট হত বুঝতে পারছিলাম। তারপরও আরো মিনিট দশেক বসে ছিলাম, আরো একটু থাকলে ঠান্ডা হাওয়ায় তন্দ্রা এসে যেত এমন সময় সেই হিন্দুস্থানির বিবি নামলেন। মাথা খাটাবার মত মাথা আমার কোনকালে ছিলনা, তবু বুঝলাম এই রকম বউকে ঐরকম একটা লোক মারতে চাইছে মানে গন্ডগোল আছে। আমি ওকে দেখেই উঠে দাঁড়ালাম, মহিলা আমার চেয়ে বয়সে বছর পাঁচেকের বড়ই ছিল, সিঁড়ির দুটো ধাপ আগে দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘গাড়ি চালাতে জানো?’, আমি সেই আগের মত মাথা নেড়েই কাজ চালালাম। গাড়িতে উঠলাম, স্টার্ট দিলাম, গাড়ি চলল। তখন কলকাতায় গাড়িঘোড়া খুব বেশি ছিলনা, খানিকটা যাবার পর মহিলা আমায় উদ্দেশ্য না করেই বলে উঠল, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছো জানো?’, চালাতে চালাতেই না তাকিয়ে মাথা নাড়লাম ছোট করে। আবার কথা বলল, ‘এর আগে কোথায় গাড়ি চালাতে?’, কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। আর আমার মেয়েদের সাথে কথা বলতে খুব ভালোলাগত না, কি সমস্যা ছিল আমি জানিনা, তার উপর এই সুন্দরী মহিলার গা থেকে এক মিষ্টি গন্ধ আমার বিরক্তই লাগছিল। আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কি?’, আমি আবারও চুপ করে রইলাম। ‘অ্যাই তুমি বোবা নাকি?’, একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছিল মহিলা, এবার বলতেই হত, খুন করতে যাচ্ছি কি নাম বলি? সুবল নামটাই মনে এল। ‘যাক বাবা, বোবা নও তাহলে, আমি আগেই একবার কথা বলে নিতে চেয়েছিলাম, তোমার সাহেব বললেন, তিনি ঠিক বুঝে নেবেন। এমন সময় নন্দদার মা মারা গেল! নন্দ আমাদের গাড়ি চালায় ১৩ বচ্ছর ধরে চালায় জানো। আমি বললাম ও ফিরে আসুক তারপর যাবো, তিনি বললেন এদের বয়স হয়ে গেলে নাকি এসব মিথ্যে বলে কিছু টাকা নিয়ে দেশে চলে যায় আর ফেরে না, কিন্তু ওর ট্রাঙ্ক টাঙ্ক সব ওর ঘরেই পড়ে আছে...’, মহিলা বলে চললেন, আমার মাথায় খুনের ছকটা পরিষ্কার হয়ে এল, পুরোনো ড্রাইভারকে সরিয়ে দিয়ে, নতুন ড্রাইভার তাও একদিনের জন্য, এদিকে মারবার কারণটা ভাবলে আর মহিলাকে দেখলে আবার দুটো মিলছে না। ‘অ্যাই ছেলে, কি নাম যেন তোমার?’- মহিলার ডাকে আবার চটকটা ভাঙল। সুবল, বললাম আমি, ‘তুমি এত কম কথা বল কেন বলোতো? আমি চুপ করে থাকতে পারিনা, তাই তো বাড়ির কাজের লোকগুলোকে সব বাঙালী রেখেছি। তোমার সাহেব তো বাড়িতেই থাকেনা, সারাদিন ইয়ে কাম, উয়ো ধান্দা এই জন্যেই তো আমায় সরিয়ে দিতে চাইছে।’, বলে একটু চুপ করল, আমি একটু আড়চোখে চেয়ে নিলাম সরিয়ে দিতে চাইছে শুনে। এরপর বেশ কিছুক্ষণ একদম চুপ।
গন্ধটা আমার তাড়িয়ে বেড়ালেও বুঝতে পারছিলাম না সেটা ঐ মহিলার গায়ের গন্ধ না বাইরের, তবে ভাবলাম বোধহয় এবার ক্ষান্ত হল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা কথা আমাকে আবার নাড়িয়ে দিল, ‘আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ’- এবার গলার আওয়াজটা অনেক মাপা এবং শান্ত। আমি ঘুড়ে তাকাতে গিয়ে নিজেকে আটকে নিলাম কিন্তু শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। মহিলা ঐ শান্ত ভাবেই বলতে লাগল, ‘এটা অনেকদিন ধরে সাজানো, নন্দদা এসে ছুটি চাইতেই আমি বুঝতে পারি সে মিথ্যে বলছে। আমি জানো কেউ মিথ্যে বললে একটা গন্ধ পাই’। ইচ্ছা করছিল নাম বলার সময় পেয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করি, কিন্তু পারিনি। ‘তোমার সাহেব’- বলে আবার বলতে শুরু করল, ‘আগে আমায় সব জায়গায় নিয়ে যেত, সব কথা বলত, কিন্তু কিছুদিন যাবত আমায় একটু এড়িয়েই চলছে, জিজ্ঞেস করলেই মিথ্যে বলছে। এই লোকটাই ওর বাড়ির বাড়ির বিরুদ্ধে গিয়ে আমায় বিয়ে করে, আমার বাড়িরও মত ছিলনা কিন্তু অদ্ভুত একটা আকুতি দেখেছিলাম ওর মধ্যে, সেই লোকটা এখন দিনের পর দিন রাতে বাড়ি ফেরেনা, মানে ওর নিজের বাড়িতেই থাকে, ওর মা আমায় মেনে নেয়নি বলে এই বাড়িটা আমায় করে দিয়েছিল। দু-চারদিন আগে যখন এসে বলল ব্যবসার কাজে নাকি বেশ কিছু বাইরের লোক এই বাড়িতে আসবে তাই আমি বাপের বাড়ি গেলে ওর সুবিধা হয়। আমি স্পষ্ট মিথ্যে বুঝতে পারলাম কিন্তু কিছু বলিনি কি বলব?’- একটু যেন গলাটা কেঁপে উঠল মহিলার, আমি এসব কথার মধ্যে খালি ভাবছিলাম হিন্দুস্থানি ব্যবসায়ীর কথা, হঠাৎ বলে উঠল, ‘একটু দাঁড় করাও না গাড়িটা চা খাব’। আমার উপর নির্দেশ ছিলনা এরকম পরিস্থিতিতে কি করব, কিন্তু কেন জানিনা মনে হল মহিলা আরো কিছু বলতে চায়, দাঁড় করালাম একটা ধাবা দেখে’। মদের বোতলটা তুলে চুমুক দিতে গিয়ে দেখে মদ নেই, কথকের নেশার বস্তুর অভাবে আমরা একটু ইতঃস্তত বোধ করলেও, চন্দন, ‘আরেকটা ভালো সিগারেট দিন বলে গল্পটা আবার আরম্ভ করে দিল, পয়সা নিতে গিয়ে আবার দেখলাম, মহিলা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, আমি চেয়েও ঝট করে চোখটা সরিয়ে নিতে পারলাম না, আমার হাত থেকে চা নিতে নিতে মহিলা বলল, ‘তুমি পারবে আমাকে মারতে?’ যেন খুব মজার একটা জিনিস হতে চলেছে।– ‘দেখো খুব একটা কষ্ট দিওনা একটা গুলি টুলি করে যদি, কিন্তু তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছেনা তুমি মানুষ মারতে পারবে,’ আমি কোনোদিনও এত সুন্দরী কোনো মহিলার এত কাছে আসিনি, কল্পনাও করিনি, কথা বলা তো দূরে থাক। চা নিয়ে এলাম, খেতে খেতে এত কথা বলছিল মহিলা যে আমারও ইচ্ছা করছিল কিছু বলি, কিন্তু কি বলতে হয় জানিনা বলে চুপ ছিলাম। চা খাওয়া শেষ হলে আমি গাড়িতে উঠতে যেতেই মহিলা বলে উঠল, ‘কি দিয়ে মারবে বললেনা তো’, আমি যেন রোজ সকাল বিকাল খুন করে উঠে জলখাবার খাই এভাবে জিজ্ঞাসা করল, আমি চুপ করেই থাকলাম। মহিলা একটু এগিয়ে এসে, গন্ধটা আরো নাকে লাগিয়ে দিয়ে আমার মুখটা দেখে বলল, ‘আহারে বাচ্চা ছেলে, কি যেন নাম বলেছিলে?’- এবার কেন জানিনা আসল নামটাই বললাম, অদ্ভুতভাবে হাসল নামটা শুনে, তারপর বলল ‘আমি একটু গাড়ি চালাই?’ আমি একটু অবাক হয়ে তাকাতেই আবার একটু হেসে আমার হাত থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে নিয়ে বলল ‘চালাতে জানি আমি, দেয়না চালাতে। শেষ ইচ্ছাই মনে করো’, আমি চেয়েও কিছু বলতে পারলাম না আর ঠিক সেই সময় হিন্দুস্থানির সাবধানবাণী কানের মধ্যে, “...শালী মে জাদু হ্যায়, ফিসল গ্যায়া তো নিগল জায়েগী পুরা” চমকে উঠলাম নিজের মধ্যেই’। এই অবধি বলে থেমে গেল নিজের মনেই যেন কি একটা ভাবতে লাগল, ভাবলাম বিড়ি টিরি ধরাবে হয়ত। রাণা বলে উঠল, ‘তারপর কি হল?’। চমক ভেঙে হালকা একটু হেসে উঠল চন্দন, বলল, ‘সুবল, আমাকে প্রায়ই বলত মাল খেয়ে যে, ‘ধান্দার সময় প্রেম করবি না, প্রেমের সাথে ধান্দা করবি না’। প্রেম আমার আসত না বলে কথাটা নিয়ে আমি আর ভাবিনি কখনও, তবে সেই সময় দাঁড়িয়ে, সুবল আর হিন্দুস্থানির সব কথা আমি জলের মত বুঝে গেলাম। কষ্ট হচ্ছিল সেই সময়, আরেকটু সময় পেলে যেন ভালো হত। মনে মনে ভাবলে দেখি গোয়েন্দা পুলিশরা অনেক খুনীদের নিয়ে হিমশিম খেয়েছে, আমি চাইলেই তাদের মাথায় আরেকটা বোঝা বাড়াতে পারতাম। আমার পকেটে একটা বন্দুক ছিল আর নিয়েছিলাম খানিকটা বিষ, মহিলা কষ্ট সেরকম পায়নি তবে লাশটা ফেলে দেবার আগে দেখেছিলাম ঠোঁট নীল হয়ে গেছে, গন্ধটা আরো একবার পেয়েছিলাম। গাড়িটা একটা জায়গায় ধাক্কা মেরে সামনের দিকটা তুবড়ে দিয়ে ফেলে রেখে চলে গেছিলাম। এরপর আর সুবল বা কারোর সাথে দেখা করিনি আর, কি হল তার খবরও নিইনি’, পুরোপুরি থেমে গেল চন্দন, বুঝলাম গল্প শেষ।
অশরীরী নিয়ে শর্টফিল্ম করা হয়নি আমাদের তবে একটা গল্প পেয়েছিলাম নিঃসন্দেহে। বিশুর পরদিন দাবি ছিল ঐ অঞ্চলে চন্দন নামে নাকি কেউ থাকেনা, কেউ দেখেওনি ঐ চেহারার লোককে। অকারণ একটা গল্প দিয়ে গেল, চন্দন হোক বা কোন অচেনা অশরীরী!

Wednesday, July 18, 2018

একটি পরিকল্পিত হত্যা কাহিনী-২


চন্দন নিজের মনেই যেন বলে চলল, ‘ফিলিম মানে আপনাদের যদি মনে ধরে তাহলে, নইলে এমনি শুনতে পারেন। আসলে দুপুরে আপনাদের কথা শুনে... আর তারপর এই গল্পটা আপনাদের বলবো বলে বেগ এসে গেল...’ এই অবধি বলে লোকটা একটা পজ নিল, যেন আমরা বারণ করলে আর বলবে না। আমাদের মশাই গল্পের ভান্ডার তবু তার অনেক প্যাখনা আছে, কার রাইট, কে কিনে রেখেছে, লেখক বেঁচে আছে কিনা, থাকলে তিনি দিতে চাইলেও তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, জামাতা আপনার ক্রিয়েটিভিটি মেপে দেখার চেষ্টা করবে, তারপর আছে প্রোডিউসার নামক এক অদ্ভুত জীব যিনি সব কিছু ইউনিক চান আবার যা বাজার চলতি তার গন্ধ থাকতে হবে, এ এক বিস্তর হ্যাপা, তাই রাস্তা ঘাটে, আদারে-বাদাড়ে, ডাস্টবিনের ধারে গল্প পেলেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি। তারপরে এমন চাঁদনী রাত, গল্পটা খারাপ হলে ঠিক কাটিয়ে দেবো আর ভাল হলে তো কথাই নেই।
‘আমি এখানকার লোক নই’, এই বলে আবার শুরু করল চন্দন, কোথাকার লোক সেটা উহ্য রেখেই বলল, -“আমার যখন ১৭ বছর বয়স, তখন আমার মা মারা যায়, আমার বাবা আবার এমনিতে খুব দরিয়া মেজাজের লোক ছিল বুঝলেন, দোষের মধ্যে রোজ একবার করে গলা অবধি মদ খেত তাতে সে মাতলামি করতনা কিন্তু তারপরেই তার শরীর জেগে উঠত। এই করে করে আমরা ন’ভাই বোন হলাম। গুণের মধ্যে বাপ আমার, মায়ের মধ্যেই শায়রা বানুকে খুঁজে পেত, তবে মায়ের শরীর দিন দিন ভাঙতে লাগল।আমি আর আমার এক বোন এই দুজন একটু স্কুলে পড়তে পেরেছিলাম, বাকীদের সে সুযোগ আর হয়নি। মা মারা যাওয়ার পর বাবার মেজাজ খারাপ হতে লাগল, কাজে যেতনা, দিনরাত আমাদের খিস্তি করত, এদিকে আমাদের পেটে ভাত নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম পেটে মদ পড়লে বাবার চরিত্র পালটে যায়, অথচ বাইরে যাবার সাহস আর পয়সা দুটোই নেই। আমার চেহারাটা ছোট থেকেই বড় সড় ছিল বলে আমি ফাইফরমাস খাটা, মাল বয়ে দেওয়া এসবের কাজ পেতাম তবে আমি বুঝতাম এসব ছোট কাজে আমার পোষাবে না। বাবা আমার ঐ চেহারার জন্য আমায় কিছু করতে পারতনা, কিন্তু ছোট ভাই-বোন গুলোকে কারণে অকারণে মারত। আমি নিজের মধ্যে একটা রাগ টের পেতাম। একদিন আমার বাপ, আমার সামনেই আমার ১৫ বছরের বোনকে সপাটে চড় মারল আর বেশ্যা বলে গালি। সামনে আমার একটা মাটি কাটার কোদাল পড়েছিল, কান গরম হয়ে গেল আমার, মায়ের মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছিল, বেরিয়ে চলে গেলাম। সেদিন প্রথম আমি মদ খেলাম, কিছুই বুঝলাম না আমি, নেশাও সেরকম হল বলে মনে হলনা। আমি বাবার জন্য বুঝলেন, রোজ আর বাড়ি ফিরতাম না, কিন্তু সেদিন ইচ্ছা হল বাড়ি ফেরার খিদেও পাচ্ছিল খুব। বাড়ির উঠোনে পা দিতেই একটা চাপা চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ এল। আমার ছুটে যেতে ইচ্ছে হল কিন্তু কেন জানিনা আমি পা টিপে টিপে পিছন দিক দিয়ে গেলাম। সেই রাতে আমি আমার বাবার মাথা থেঁতলে দিয়ে মেরে ফেলেছিলাম”- এই অবধি বলে একটু থামল চন্দন একটা বিড়ি ধরাবে বলে। রাত কত হল আমাদের খেয়াল নেই, আমি আমি বছর ৪০-র ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে এসে দেখি, সবাই খুব জমে গেছে চন্দনের চারপাশে। চাঁদের আলোয় সবাইকে অল্প অল্প দেখাযায়, সবাই নেশাতুর, সবাই মগ্ন।
বিড়ি তে দুটো টান মেরে আর এক চুমুক মদ খেয়ে চন্দন আবার শুরু করে দিল- “মনের রাগ ইচ্ছে মত ঝেড়ে ফেলতে পারলে একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়, আমি যতবার কাউকে মেরেছি, সে ঘুষি, লাথি, ছুরি যাই হোকনা কেন নিজেকে ততবার বেশি করে মানুষ মনে হয়েছে, শুধু একবার ছাড়া। বাবাকে মেরে ফেলার পরই বুঝলাম আমি আর গ্রামে থাকতে পারবনা, বোনের দিকে তাকাতে সে-ও যেন নীরবে তাই বলল। ভাইবোন গুলোকে এমনিতেও খাওয়াতে পারব কিনা জানতাম না, আমার মনে কোন পাপ বা ভয় কাজ করলনা আমি সেই রাতেই একটা মেল ট্রেনে উঠে পড়লাম। কলকাতায় চলে এলাম, তারপরের চারবছর আমি বাড়ির চাকর থেকে, মিথ্যে সাক্ষী, মেয়েমানুষের দালালি সব করেছি কিন্তু চুরি করিনি। এত করেও আমার কিছুই ভাল লাগছিল না, আমি অনেকবার মেয়েদের কাছ থেকে সুযোগ পেয়েছি কিন্তু তাতেও আমার মন যেতনা, মেয়েদের আমার ভালোলাগত না, কেন জানি। এই সময় একটা লোকের সাথে আলাপ হয়, নাম সুবল। সে নাম বলত সুবোল। এই সুবোল বড়লোকের ছেলেদের নেশার জিনিস যোগাত, গরীবদের ও দিত তবে সাথে উপদেশ উপরি থাকত আর গরীবদের কাছে দামটা একটু কম নিত। আমাকে কেন জানিনা সুবোল খালি নেশা না করার কথা বলত, আমি অবশ্য নেশা করে সেসময় বিশেষ আরাম পেতামনা বলে ঝোঁক ছিলনা খুব একটা। একটা কথা বলে রাখা ভাল, কিকরে যেন আমার বাংলা ভাষাটা ভাল লেগে যায়, আমি মাঝে একটা বই এর দোকানে মোট বয়েছিলাম, বাইন্ডিং-এর কাজ শিখেছিলাম, তারপর কাজ ছেড়ে দিয়েও সেখানে গিয়ে টুকটাক পড়ে আসতাম। আমি শুধু সুবোলকে বলতাম আমার অনেক টাকা চাই, আর সুবোল বলত হবে হবে। একদিন সুবোল বলল, ‘আরেকটা খুন করতে পারবি?’- সুবোল আমার ঘটনাটা জানত। আমি কাকে জিজ্ঞাসা করায় বলল, এক হিন্দুস্থানির বউকে, এর বেশি ও কিছু জানেনা। আমার মনে হল, হিন্দুস্তানীরা আর যাই করুক বউ মারতে চাইবেনা। সেরাতে অনেক ভাবলাম। একটা খুন করেছিলাম ঝোঁকে, আরেকটা খুন করব জেনে বুঝে! আবার মদ খেলাম, সুবোলের সাথে বসেই খেলাম, তবু মাথাটা ছাড়ল না। সুবোল তখন মাথাটা বাগে আনাতে অন্য নেশা করালো। কি বলব, সেরাতে যেন আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেল, আর পাশে বসে সুবোল গীতার বাণী ওর বয়ানে বলে যেতে লাগল। আমি যেন স্বচক্ষে সেসব কথাগুলোকে রক্তমাংসের মানুষের মত দেখতে পেতে লাগলাম।
পরদিন সকালে নেশা কেটে গেলেও দেখলাম মাথায় বিবেকের কোন চাপ নেই। অন্যের বউ, সে-ই মারতে চাইছে, আমি উপলক্ষ্য মাত্র, আর গরীব আর বড়লোকদের মশাই পাপ-পূন্য নিয়ে মাথা ঘামালে চলেনা”। আবার একটা বিড়ি ধরানোর বিরতি। দেখলাম রাণা হাঁটু মুড়ে বুকের কাছে নিয়ে গুটিশুটি মেরে বসেছে, অভিজিত চোখ নাচিয়ে ওর মজা বোঝালো। বিশুর নিমিলীত চোখ দেখে বুঝলাম টীকা-টিপ্পনি পরদিন পাব। চন্দনের ঐ আরেকটা খুনের ঝুলিয়ে রাখা রহস্যটা ওর নিজের গল্পের ফাঁকেও বেশ গাজর হয়ে ঝুলছে বুঝতে পারলাম।
বিড়িটা ধরিয়েই, চন্দন শুরু করল, পরদিন চলে গেলাম সুবোলের দেওয়া ঠিকানায়, ফ্রী স্কুল স্ট্রীটের কাছে একটা ছোট্ট অফিসের ভিতর এক হিন্দুস্থানি বসে আছে সুবোলের কথামতো। লোকটার গায়ে গোলগলা পাঞ্জাবি আর পাজামা, ফরসা, একটু মোটার দিকে চেহারা কিন্তু লম্বা, তবে গলার কাছে ভাঁজে ভাঁজে চর্বি কিরকম একটা বিরক্তিকর। লোকটা প্রথম প্রশ্ন করল, ‘তু বঙ্গালী হেয় ক্যায়া?’। কি ভেবে বলে দিলাম, না। লোকটা বসতে বলল। একটু বুঝে নিয়ে বলল, ‘মেরি বিবিকো মারনা হ্যায় তুঝে, পতা হ্যায় না?’। মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম জানি, বুঝলাম লোকটা সাফাই গাইবে আর আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না করলেও শুনতে হবে। ‘গাড়ি চালানা আতি হ্যায় না তুঝে’-আবার মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম। লোকটা মাথা নেড়ে বলল, ‘বদচলন হ্যায় ও, বদচলন সামঝতা হ্যায় না? মেরি হি ভুল থি, বেজাত মে শাদী করলি। বঙ্গালন হ্যায় ও। ন্যশে সি চড় গয়ি থি ও দিমাগ পর। মায়া জানতি হোগী শালী। না কুছ ওউলাদ দিয়া না সুখ, উপর সে ইস পানচ সাল মে মেরা ধান্দা মন্দা হোতে যা রহা হ্যায়। শালী কি নিয়ত মে খোঁট হ্যায়’- বলে একটা ছবি ছুঁড়ে দিল টেবিলের উপর, সাথে বেশ কিছু টাকা আর একটা গাড়ির চাবি। -‘তসবীর কে পিছে অ্যাড্রেস লিখা হুয়া হ্যায় ম্যায় সব বন্দবস্ত করকে রাখখা হু। তু মেরা ড্রাইভার কে বদলী মে জায়েগা, ম্যায় বোলকে রাখখা হু কে ইহা পে মেরা কুছ ন্যায়া কাম শুরু হোনে বালা হ্যায়, অউর ইসলিয়ে কুছদিনকে লিয়ে উসে মাইকে ভেজ রহা হু। কাম খতম করকে রাসতে মে বডি ফেক দেনা, জাগাহ দেখ কে’। আমি আবার মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসছিলাম টাকা, চাবি আর ছবি নিয়ে, লোকটা পিছু ডেকে উঠল,- ‘শুন, বাকি পয়সা তেরে পাস পৌঁহছ জায়েগা, লেকিন দোবারা মুঝসে মিলনা মত, তেরা নাম নেহী পুছুঙ্গা লেকিন ইতনা ইয়াদ রাখনা কে শালী মে জাদু হ্যায়, ফিসল গ্যায়া তো নিগল জায়েগী পুরা’। আমি শুনে বেরিয়ে গেলাম’।
ক্রমশ...

একটি পরিকল্পিত হত্যা কাহিনী-১


২০১২ সালে ঠিক করছিলাম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'অশরীরী' গল্প নিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম বানাবো। আমাদের তখন শরীরে জোয়ার, মাথায় জমাট বারুদ আর মনে ছাই চাপা আগুন, তা স্ক্রিপ্ট বানিয়ে ফেললাম, দু একজন অভিনেতা অভিনেত্রীর সাথে কথাও বলা হল। আমাদের সমস্যা ছিল টাকার, শর্টফিল্মের বাজার নেই কে দেবে টাকা? আমরা তখন স্বপ্ন দেখি বাজার তৈরী করব। গল্পটার জন্য একটু রিমোট লোকালয় দরকার ছিল, তা আমরা সে বছরই দোলের সময় শান্তিনিকেতন গিয়ে একটা বাড়ি দেখেছিলাম যেটা হলে আমাদের লোকেশনের ষোলকলা পূর্ন হয়। 


আমি, অভিজিৎ, বিশু আর রানা মিলে চললাম বাড়িটা বাগাতে, একবন্ধু বাড়িটার মালিকের খোঁজ যোগাড় করে দিয়েছিল। 
কলকাতা ছাড়লে যে কাজই থাকুক না কেন আগে খোঁজ পড়ে মদের। আমাদের একটা থাকার জায়গা ছিল রতনপল্লী (পল্লী বা পুর হবে মনে নেই)তে। পৌঁছে সেদিন রাতটা নেশা করে আর মালিকটির সাথে কথা বলা হয়নি। পরদিন ফোন করায় ভদ্রলোক বললেন, তিনি আজ শান্তিনিকেতনের বাইরে কাল আসবেন। আরেকটা দিন পাওয়া গেল মদ খাওয়ার জন্য। 
দুপুরবেলার দিকে বসে বসে অকারণ সময় নষ্ট করছি, একটা লোক এসে আমাদের দরজার কড়া নাড়ল, দরজা খোলাই ছিল তবুও কড়া নাড়ল। কি ব্যাপার জিজ্ঞাসা করায় অদ্ভুত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, তাকে আমাদের ঘরদোর সাফ করার জন্য পাঠানো হয়েছে। আমাদের এক খাস বন্ধুর দিদি বিশ্বভারতীর প্রফেসর অতএব আমরা একটু খাতির পাই। 
বিশুই আমাদের মধ্যে একটু বলিয়ে কইয়ে, জিজ্ঞাসা করল, 'কি নাম তোমার?'
-চন্দন। এক কথায় উত্তর দিল।
ঘর পরিষ্কার করার লোক নিজেই এত নোংরা আমার দেখে ভাল লাগল না। আমরা নিজেদের মত রাতের শুটিং কেমন করে করব? কতটা আলোর দরকার, বিনা পয়সায় কিভাবে অশরীরী কে মুর্তমান অথচ বিদেহী দেখাবো এসব প্ল্যান করতে লাগলুম। লোকটা বার কয়েক আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখল কিন্তু কোন অভিব্যক্তি দেয়নি। অদ্ভুত দেখতে লোকটাকে, প্রায় 6ফুট হাইট, মানানসই পেটানো চেহারা, হাতের পাঞ্জাটা লোভনীয়, একসময় বাইসেপ ট্রাইসেপ দেখা যেত নিঃসন্দেহে, আমরা মৃগয়ার মিঠুনে চলে গেলাম। 
আমরা যখন মিঠুন থেকে জ্যাকি শ্রফ, সঞ্জয় দত্ত, সালমান খান হয়ে হৃতিকে আসব আসব করছি তখন লোকটা একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, কিছু একটা বলব বলব ভাব। 
- কিছু বলবে? অভিজিৎ জিজ্ঞাসা করল।
-ফিলিম বানাবেন?
এর কাছ থেকে 'ফিলিম' শুনব আশা ছিলনা, বললাম, হ্যাঁ। 
ঘাড় নেড়ে চলে গেল, কি বলব বুঝতে পারলাম না।
বিশু হচ্ছে আমার পৃষ্ঠপোষক, মন্ত্রণা দাতা এবং সমালোচক। তবে ওর লোকেশন দেখতে আসার কোন দরকার ছিলনা। তখন আমরা ছিলাম কাঠ বেকার আর আমাদের যৌবন ছিল আরো শুকনো। বিশু এসেছিল সেই গামবাট যৌবনকে খোয়াই নদীতে এপিঠ ওপিঠ করে ভিজিয়ে নিতে। 
সন্ধেবেলা আবার আসর বসব বসব করছে এমন সময় বিশু হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, ' চ, চ একটা সেক্সি জায়গায় নিয়ে যাবো, ডবকা চাঁদ দেখতে দেখতে ভদকা খাবি'। মধু আর চাঁদের কম্বিনেশন যখন ভাল, তখন মদ আর চাঁদের কম্বো নিশ্চয়ই আরো ভাল হবে। যেতে যেতে জানতে পারলাম বিশু দারুন গাঁজার ব্যবস্থা করেছে। 
যেখানে গিয়ে বসলাম জায়গাটা অসম্ভব বা হয়ত ঐ সময় কোন এক কারণে ওরকম মায়াবী হয়ে ছিল। দু-তিন পেগ খেয়ে মনে হচ্ছিল এখানেই কিন্নরীরা বিশেষ সময়ে নামে বোধহয়। তখনও গাঁজা আসেনি, শুনলাম ঐ চন্দনকে কিকরে যেন পটিয়ে গাঁজার ব্যবস্থা করেছে। চন্দন আরো মিনিট 20 পরে সিলিউট থেকে মহাকাল সদৃশ ল্যান্ডস্কেপ তৈরী করে সামনে এল।
অভিজিৎ মদ খেয়ে চুপ করে থাকা প্র্যাকটিস করে, আর জিজ্ঞাসা করলে বলে, 'ভাবছি'। এই রকম চাঁদের আলোর নীচে আমার যাবতীয় আদিম ইচ্ছে গুলো আমাকে নাগপাশের মত বেড়ে ধরতে লাগল। গাঁজা বানানো হয়ে গেছে, বিশু টানছে, অভিজিৎ বলল পরে খাবে, রানা ক্যামেরা নিয়ে কি একটা করে যাচ্ছে, আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সেই ধোঁয়ার পিছন পিছন দৃষ্টি নিয়ে গিয়ে দেখলাম দুটো গাছের ফাঁকে ধোঁয়াটা মিলিয়ে গেল আর একটা মায়াবী আলো তৈরী হয়েছে সেখানে আমার মনে হতে লাগল ওই খান থেকে একটি নারী এসে আমাকে ইশারায় তার সাথে যেতে বলবে, যাদের বয়স বাড়ে না... যৌবন রোজ রোজ ব্যবহারেও অক্ষুন্ন থাকে তারা...।
চিন্তায় ছেদ পড়ল, চন্দন আমার গায়ের একেবারে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, একটা দামী সিগারেট দেবেন? দিলাম! দেখলাম অভিজিৎ ভাবসাগর থেকে ভেসে উঠেছে, বিশু পা ছড়িয়ে একটু লেদরে গেছে। চন্দন সিগারেটে একটা দেড় বিঘত লম্বা টান দিয়ে বলল, এসব খাসা সিগারেট টানলে দমে লাগেনা, বলে আবার টানতে লাগল। একটা সিনেমার গল্প শুনবেন?- আনমনেই বলল। ভাবার চেষ্টা করতে লাগলাম সিনেমার গল্প বলতে লোকটা কি বোঝাতে চাইছে।
ক্রমশ...

Saturday, July 14, 2018

গঙ্গারাম আর আমি


আমি আগেই বলেছিলাম আমার বিষন্নতায় গঙ্গারামের জন্ম। আচ্ছা, আচ্ছা গঙ্গারাম অব্যয় অক্ষয় আগেও ছিলেন শুধু আমার মন খারাপ হলে উদয় হন। এইটুকু শুধু এইটুকু কনসেপ্ট নোলনদা বা রিচিদাকে গিয়ে শোনাতে পারলে দেখতেন কেমন একটা কায়দার হলিউডি কাল্ট তৈরী হয়ে যেত। যাক আক্ষেপ আমার প্রিয়তমা সে এসে বসলেই গঙ্গারামও এসে হাজির হন, আক্কেলটা ভাবুন! এবার আমি কী করব বলুন দুঃখ হলে আমার মন খারাপ হয় আর মন খারাপ হলে দুঃখ।
এবার যদি ভেবে থাকেন গঙ্গারাম একটা সাধারণ ত্রিমাত্রিক চরিত্র যা আমিও ভেবে আসতাম এতদিন তাহলে ভুল করবেন। গঙ্গারাম সতত পরিবর্তনশীল একটা চরিত্র। গত কয়েকদিনে আমি শার্লক হোমস পড়তে শুরু করেছি, সেই সাথে সেক্রেড গেমস দেখে ফেলেছি, ফলত একজন চিন্তাশীল ব্যক্তির কাছে নেশার কি অমোঘ প্রয়োজনীয়তা এটা আমার কাছে পরিষ্কার। আবার আমি সাধারণ মানুষ আত্মা উপর দিকে উঠলেই নীচে নামতে চায় তাই নওয়াজউদ্দিনের মত লুঙ্গি মুখে নিয়ে...যাক বাদ দিন।
কথা হচ্ছে আমার কথা উঠছে কেন? আমি না থাকলে গঙ্গারাম আসত না এটা একটা সার সত্য। এবার আমি টাকে আপনি কিভাবে নিচ্ছেন সেটা হচ্ছে প্রশ্ন। গঙ্গারাম হল একটা অস্তিত্বময় প্রশ্ন। গঙ্গারামকে আসতেই হবে তার আগে একটু ভূমিকা।
আমি একটা প্রকান্ড উপন্যাস লিখতে চাই, এখনও অবধি যতটা মশলা জোগাড় হয়েছে তাতে এগোনো যায়, তবে আমার বই পড়ার সময় এই অভ্যাস না থাকলেও নিজে লেখার সময় শেষটা না দেখা থাকলে শুরুটা করতে পারিনা। বা অন্যভাবে শুধু শেষ নয় আমি সম্পূর্ণ ম্যাপটাই দেখতে চাই। এইরকমই ভাবছিলাম বসে, মুম্বইতে বসে ভাববার একমাত্র জায়গা হল ট্রেন। ট্রেন আমার ভাবনাবিলাসের অন্যতম পীঠস্থান। দাদর পার হয়ে গেছি ভাবছি আর একঘন্টা সময় ঘুমোবো না বাজে লিখব। আজ ট্রেনে কুম্ভ মেলা বসে যেতে পারে এমন অবস্থা, অন্যদিন চুলকুনি পেলে অন্যলোককে জড়িয়ে ধরতে হয়। ঠিক এমন সময় মাথায় ঠাসা ঢেউ খেলানো ব্যাক ব্রাশ করা চুলের একজন লোক ট্রেনে উঠলেন মাটুঙ্গা স্টেশন থেকে। একদম সামনা সামনি বসলেন, স্থির চোখ, গালের চামড়া টানটান, থুতনি দৃশ্যমান, হাত গোটানো শার্ট গুঁজে পড়া, নীচে জিন্স। চিনতে পারলাম না তবু মনে হল কোথায় দেখেছি। চোখ সরিয়ে মনটাকে লোকটার থেকে সরালাম, উপন্যাসে ফেরালাম। উপন্যাসটা একটা গোয়েন্দা কাহিনি, আবার শুধু গোয়েন্দা এমন নয়, একজন খুনী আছেন যিনি মারাত্মক সব খুন হরিনাম জপতে জপতে করে দেন, একজন গোয়েন্দা আছেন যার স্ত্রী তার থেকে বেশি বুদ্ধিমতী, একটি প্রেমিক গোছের আঁতেল ছেলে আছে আর একজন সুন্দরী আছেন এর বেশি ট্রেলারে বলা যায় বলুন! এইসব যখন ভাবছি তখন প্রশ্নটা এলো- 'এত ভাবার দরকার আছে?'। সত্যি কথা পুরো কানচাপাটির মত আঁছড়ে পড়ে, এ আমি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু লোকটা কে? ভেতো দেখতে নয়, গ্যাদগ্যদে গলা নয়, অকারণ উপদেশ নয় অথচ বাঙালী, কাল্টিভেট করতে হবে মনে হচ্ছে।
কে আপনি?- এই প্রশ্নটাই বেরিয়ে এল প্রথমে। নিজেকে সংযত করতে চেয়েও পারলাম না।
চোখের কোণে হেসে বললেন, 'চিনতে পারবে, অত তাড়া কিসের? পালিয়ে তো যাচ্ছি না।
-বেশ, চিনলাম না, কিন্তু প্রশ্ন তো থেকে যাচ্ছে।
- করে ফেল।
-আপনি কে? আমি কি ভাবছি জানলেন কি করে? জেনে ফেললে কি জানলেন?
- সামান্য পর্যবেক্ষণ। তুমি স্থির চোখে দেখলে অথচ কিছু বুঝতে পারলেনা, আমি তোমার চোখে চোখ রাখলাম তুমি সরিয়ে নিলে, মোবাইল টা তিনবার খুলে অনিচ্ছুক ভাবে স্ক্রল করে গেলে এগুলো ভাবার লক্ষণ কিনা?
-আর কি ভাবছি?
-সে কথা কি আমি কিছু বলেছি?
- অ, তা আপনাকে চেনা লাগছে কিন্তু...
- তুমি লিখবে গোয়েন্দা গল্প, হয়েছে!
- ব্যক্তিগত মতামত হয়ে গেল না? কিন্তু উত্তর পেলাম না।
- না ব্যক্তিগত নয়, একজন গোয়েন্দা যেটা ভাববে তার সৃষ্টিকর্তা কে তার উর্দ্ধে জেতে হবে, গোয়েন্দার pov কে ছাপিয়ে যেতে হবে। রহস্যসৃষ্টি এবং উদ্ধার তোমার হাতে।
- নিজেকে কিরকম ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বলে মনে হচ্ছে।
- ওটুকু স্পর্ধা তো করতে হবে।
- কিন্তু ইনফো গুলো বেশ কিছু বাকি যে...
- আজ সকালে কি পড়েছো?
- উফ, কত জানেন আপনি। পড়েছি, 'লিখতে ভালো লাগে বলে লেখো, যশের পিছনে ছুটো না, যশ আপনিই আসিবে'। আচ্ছা রাজকুমার হিরানী কি বঙ্কিম পড়েছিল?
-আহ। যা বলছিলাম, এডিট বলে একটা বস্তু হয় জানো বোধহয়।
- আজ্ঞে।
- যে চিন্তাটা আসছে ওটা বাদ দিয়ে আসল কথা ভাব। জটায়ু জিতবে না হারবে তা ভেবে দেখতে গেলে রামায়ণ লেখা হতনা।
- হ্যাঁ আজকাল লেখার মান, বিষয় এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।
- সেটা প্রতিপাদ্য হল?
- না মানে ভিতরকার বর্জ্য গুলোও তো বেরোতে হবে
এতদূর বলার পর দেখি লোকটা উঠে যাচ্ছে।
- চললেন নাকি?
- তুমি জানো তো আমার এন্ট্রি এক্সিট সম্মন্ধে, ত্রিমুর্তির কথা বললে একটু আগে।একটা ছোট্ট ধাঁধা বলে যাচ্ছি সলভ করে রেখো, আমার নাম ভাগীরথী দাশরথি।
নালাসোপারা আসার পর বুঝলাম এতদিন কেন শার্লক হোমস আমি পড়তে পারিনি।
তবে সব দুঃখে মন খারাপ হলেও, মন খারাপ সব সময় খারাপ না।

কুলের আচার ও পুরাতনী চিঠি

 মনে করুন, এভাবেই সময় চলছে... তাতে তো আর জীবন কাকু থেমে থাকবে না। এগিয়েই যাবে। মনে করুন এরকম ভাবেই ২০২৫ এর বসন্ত এসে গেছে, এভাবেই ঘরে বসে কা...