Tuesday, May 14, 2019

গরমের দুপুর আর ভগবানের রসিকতা


চুপচাপ বসে ছিলাম, সামনে ছড়ানো মোবাইল, ল্যাপটপ, কিছুতেই কিছু লিখে উঠতে পারছিনা, তার উপর এই গরম। মাঝে মাঝে আমার তুমুল মন খারাপ হলে ঘুম পেয়ে যায়। এই গরমে সেই সুখ নিদ্রাও কপালে নেই। বলছে নাকি বৃষ্টি হবে! এই সব ভাবছিলাম, মনে হল যেন মেঘ করে এল। ভাবলাম যাক একটু ঠান্ডা হবে পরিবেশটা, হঠাৎ কাঁধের উপর একটা ছোঁয়ায় চমকে উঠলাম।
- আপনি?
একটা আনমনে স্মিত হাসি হেসে খানিকটা যেন শুন্যের উপরেই বিরাজমান হলেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। গরমকালের জন্য কিনা কে জানে, ওরকম দাড়ি, জটা সমেত ঋষিকে দেখে আমিও এক মুহুর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেছিলাম। তারপর দেখলাম দাড়ির শেষের দিকটা দিয়েই একটু কপাল টপাল মুছে নিয়ে বললেন,
- পাপে ভরে গেছে হে, তাই ভানুদেবের এরকম রুদ্রমূর্তি।
বলে একটু চুপ করলেন, আমি ভাবছি কি বলব? আপ্যায়ন করার মত আমার কাছে কিছুই নেই, চা বা কোল্ডড্রিঙ্কস তো আর এত বড় একজন কে অফার করা যায়না।
- মাথায় যখন আসছেনা, তখন চলো তাহলে একটু বেরিয়ে আসি...
আমার মনে পড়ল, বউ বলেছে বিকেলে বাজার করতে হবে, তাই আমতা করে বলতে গেলাম,
- ইয়ে, আবার মহেন্দ্র পর্বতে নাকি? আমার আবার...
- আহা, সময় তো পালাচ্ছে না, আর এবার মহেন্দ্র পর্বতে যাব না।
- তাহলে?
- আহ! চলোই না, ঘুরতে ঘুরতে কথা বলা যাবে।
বলেই এগিয়ে এসে আমার হাতটা খপাৎ করে ধরলেন, মনেহল কিরকম যেন শরীরটা পাকিয়ে কোথায় ঢুকে গেল, আর কি বিশাল বড় হাতের পাঞ্জা! হাতের মুঠোটা একটু আলগা হতেই দেখলাম বিরাট এক ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আমি। চারিদিকে বিশাল বিশাল আকৃতির মানুষ সব। মানুষ বলেও ঠিক মনে হচ্ছেনা, কারুর উচ্চতাই ৭/৮ ফুটের কম নয়, সবারই উর্ধাঙ্গ মোটামুটি উন্মুক্ত। প্রথম ঝটকায় ভাবলাম আমায় বুঝি খোক্কস পুরীতে নিয়ে এসেছেন ব্যাসদেব। একটু ঠাহর করতে বুঝলাম, এরা মানুষই, বেশ সৌম্য গড়ন, গা লোমে প্রায় ঢাকা, তাই দেখতে একটু বন্য লাগছে।
-এরা কারা? আমরা কোথায়?
ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তর এলো,
- কিষ্কিন্ধ্যা
উনিও উত্তর দিয়েছেন আর আমারও চোখ পড়েছে এক মহিলার দিকে, মহিলার পোষাক একটু অন্যরকম কিন্তু যে কোনো পুরুষের মনে ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট। ধাঁ করে, লীলা মজুমদারের লেখা 'লঙ্কাদহন পালা'-র হনুমানের ডায়লগ মনে পড়ে গেল,- ' ছ্যা, ছ্যা! এরকম সুন্দরী তো আমাদের কিষ্কিন্ধ্যার রাস্তায় গড়াগড়ি খায়', কতকটা এরকমই ছিল। আচমকা একটা টানে আমি একটু সরে এলাম।
-ঐ দেখো!
তাকিয়ে দেখলাম ঠিক আমাদের পিছন থেকে একজন বিশালদেহী লোক এসে, ফটকের সামনে দাঁড়ালেন, হাতে একটা ইয়াব্বড় একটা কাস্তের মত বিশাল একটা অস্ত্র। ওখানে দাঁড়িয়েই একটা বিশাল আড়মোড়া ভেঙ্গে এক প্রহরীকে বললেন,
- মারুতি কি অন্দরমহলে আছে?
প্রহরী যেন খুব চেনে লোকটাকে এইভাবে এক লম্বা প্রণাম করে তাকে ভিতরে যেতে দিল।
-চলো
আবার হাতে টান পড়ল। যেতে যেতেই জিজ্ঞাসা করলাম,
- কোথায় যাচ্ছেন? লোকটা কে?
- ভিতরে। উনি, কৈকষী পুত্র দশানন।
- রাবন?
- নাহ, ও নামটা পাননি এখানে।
কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না, শুধু পিছন পিছন গেলাম। জায়গায় জায়গায় অসাধারণ সব ভাস্কর্য্য, এদিকে ঝরনা, সামনে এক জায়গায় ছোট্ট জলাশয়ের মধ্যে রং বেরঙের মাছ। এক জায়গায় গিয়ে দশানন দাঁড়িয়ে পড়ল। এতবড় চেহারা সামনে কি হচ্ছে দেখার জন্য উঁকি মারতে হয়। দেখি হুবহু একই রকম দেখতে দুজন বসে দাবা খেলছে, একজনের উত্তরীয় হলুদ আর একজনের লাল। দশানন দাঁড়িয়ে যেতে হলুদ উত্তরীয়র মালিক মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
-মহারাজ ভিতরে আছেন।
বলেই, অপরজনের দিকে সন্দিঘ্ন ভাবে তাকিয়ে বলল,
- আবার চাল পালটে দিলি নাকি?
- না, না! আমি কিচ্ছু করিনি।
- মনে হল যেন, তোর হাতটা নড়ে উঠল।
ঝগড়া যেন লাগব লাগব করছে, ক্রমশ দুজনের শরীর যেন ফুলে উঠছে,
- এই জন্য তোর সাথে খেলতে আমার ভালো লাগেনা
- হেরে যাচ্ছিস বলে এখন তুই ছুতো খুঁজছিস।
- তুই দাবা খেলতে পারিস?
লোম টোম একেবারে খাড়া হয়ে আসছে। দশানন একটু হেসে বললেন,
- সুগ্রীব, আমি দেখেছি, বালী কিছুতে হাত দেয়নি।
হলুদ উত্তরীয়, মানে সুগ্রীব খানিকক্ষণ দশাননের দিকে তাকিয়ে বলল,
-ঠিক বলছ? রসিকতা করছ না তো?
- ছি! ছি! মহারাজ মারুতির প্রধান দুই দেহরক্ষীর সাথে আমি রসিকতা করব?
- শোন, তুমি রাক্ষস যোনিসম্ভব হলেও, ব্রাহ্মণ সন্তান বলে আমি তোমার কথা মেনে নিলাম।
বলেই খেলায় মন দিল, আমরা এগিয়ে চললাম। এক প্রকান্ড দরজা খুলে দশানন একটা ঘরে ঢুকল। উফ! কি বিশাল ঘর। চারিদিকে দারুণ সব ভাস্কর্য্য, তৈলচিত্র, মাঝখানে এক দারুণ গদি পাতা, তার সামনে রাখা নানারকম খাবার আর মদ। মদই হবে বলে মনে হল। মাঝখানে বসে আর এক বিশাল দেহী আর তার দু পাশে বসা অসধারণ কয়েকজন সুন্দরী। দশানন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঘরের ভিতরের পুরুষটি তার পাশের সুন্দরীদের সাথে পাশা খেলছেন আর হাল্কা মজা করছেন বলেই বলেই মনে হল।
- দাঁড়িয়ে কেন? এস একটু দ্যূতক্রীড়ায় অংশ নাও।
দশাননের উদ্দেশ্যে বললেন সেই বিশালদেহী। দশানন আরো একটু অপেক্ষা করে বললেন-
- না, মারুতি, আজ একটু মল্লক্রীড়ার উৎসাহ হচ্ছে। তোমার কি আজ তেমন মতি নেই?
- না না, নিশ্চয়ই তোমার আশা পূরণ হবে দশানন, তবে একটু সুরা পান করে নাও, মত্ত অবস্থায় মল্লক্রীড়ায় আলাদা আমেজ আসে।
দশানন একটু হেসে এগিয়ে গেলেন।
সব দেখেশুনে আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না, বললাম,
- কি হচ্ছে বলুন তো?
অল্প হেসে ঋষি বললেন,
- রামায়ণ হে! তবে তোমার পড়া মত নয়। কিষ্কিন্ধ্যার রাজা এখানে হনুমান, ঐ যে...
বলে ঘরের মাঝখানে বসা, শ্বেত উত্তরীয় পড়া পুরুষটিকে দেখিয়ে দিলেন ব্যাসদেব।
- আর এই মহিলারা?
- রাজ মহিষীগণ।
- বাপরে এসব কি সত্যি নাকি?
- এটা হচ্ছে তোমাদের হিসাবে সেই সময় যখন রাবণ ত্রিলোকবিজয় করতে বেরিয়ে বালীর কাছে নাকানি চোবানি খেয়েছিল।
-আর এখানে?
- দেখতেই তো পাচ্ছ, বালী এখানে রাজাই হয়নি। রাজা নির্বাচনের সময় দুই ভাইকে একাই মারুতি হারিয়ে দেয়।
- তাহলে রাম কি করবে? কাকে নিয়ে খুঁজতে যাবে?
একটা অদ্ভুত হাসি হাসলেন ব্যাসদেব। রামায়ণ লেখা হয়নি এখানে।
- মানে? কি বলছেন?
এদিকে দু পাত্তর সুরার পর দশানন আর হনুমানের মধ্যে ধুন্ধুমার মল্ল যুদ্ধ লেগে গেছে। ভাবছিলাম দেখি একটু কিন্তু ব্যাসদেব বললেন চলো আর একটু অন্য জায়গায় ঘুরে আসি। আবার হাতে টান আর আমি কোথায় যেন সেঁধিয়ে গেলাম।
পা মাটিতে ঠেকতে দেখি এক ঘন জঙ্গল।
- কোথায় এলাম?
- জায়গাটা ঠিক জানিনা। শুধু দেখে যাও।
দেখলাম, দুই বুড়ো মত লোক একজন তো সাদা দাড়িগোঁফ নিয়ে রীতিমত বৃদ্ধ আর একজন প্রৌড় তবে চুল পাকেনি একটু কাছে আসলে মনে হল দাড়ির বার দ্বিতীয়জনের যেন বেশ একটু কমের দিকে। আরো একটু কাছে আসতেই, পিছনের জঙ্গল থেকে দস্যু মত একজন আচম্বিতে বেরিয়ে এল, একহাতে তার একটা দড়ি মত জিনিস আর এক হাতে ভোঁতা একটা অস্ত্র।
- যা আছে সব বের করে দাও।
- কে তুমি বাছা? আমরা তীর্থ ভ্রমণকারী আমাদের কাছে অর্থ করি কিচ্ছু নেই।
- ওসব বলে লাভ নেই। কিছু না থাকলে মৃত্যূ অবধারিত।
- আমার মত একজন বুড়ো মানুষকে অকারণে মারলে, তোমার কি কিছু সুবিধা হবে?
- দেখ বৃদ্ধ, দস্যু রত্নাকরের কাছে এসব তত্ত্বকথা বলে কোনো লাভ নেই।
এই অবধি শুনেই আমি ছটফট করে উঠে বললাম,
- এতো বাল্মীকি! এবারই তো সেই 'মরা মরা' গল্পটা হবে?
- আহ! উত্তেজনার মুহুর্তে, বালখিল্যতা করোনা। চুপচাপ দেখো কি হয়।
দেখতে থাকলাম, দুই বৃদ্ধর সামনে অস্ত্র হাতে দস্যু রত্নাকর।
- তা রত্নাকর, বলছিলাম নিরপরাধ, নিরস্ত্র ব্রাহ্মন কে মেরে যে পাপ হবে তার দায় কে নেবে? তুমি অর্থ নিয়ে কি করবে?
- অর্থ নিয়ে খাদ্য কিনব, বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা আছে, স্ত্রী, দুই সন্তান আছে তাদের কে খাওয়াবে? এখানে কোনো কর্মের সন্ধান নেই, চারিদিকে অরাজকতা, এখানে পাপ পূন্যের কথা ভাবার এত সময় নেই বুঝলে।
- তাহলে তোমার আসল উদ্দেশ্য খুন্নি বৃত্তির নিবারণ।
একটু যেন ভেবলে গেল রত্নাকর। বৃদ্ধ আবার বললেন,
-দেখ রত্নাকর, নানা দেশ ঘুরে আমি অনেক কিছু জেনেছি। তুমি যদি চাও তাহলে তোমার খাওয়া পড়ার একটা উপায় হতে পারে। তবে তার দুটো রাস্তা আছে।
- কি উপায়?
- প্রথমটায় একটু সময় লাগবে কিন্তু তারপর গোটা ইতিহাস তোমায় মনে রাখবে। এই হল আমার পুত্র নারদ। এ তোমায় কিছু পরাশুনা শেখাবে তারপর তোমার খাওয়া পড়ার চিন্তা তোমায় করতে হবেনা।
- আর দ্বিতীয় রাস্তা?
- দ্বিতীয়টা একটু সোজা, এখান থেকে কিছু দূরে অযোধ্যা নামে রাজত্ব আছে। রাজার নাম দশরথ। তার একজন গুপ্তচর দরকার। আমার সাথে পরিচয়ের সুবাদে আমার নাম করলেই সেখানে গুপ্তচরের পদ তোমার পাকা হয়ে যাবে।
- কি নাম আপনার?
একটু হেসে বৃদ্ধ বললেন,
- ব্রহ্মা।
- আমি তাহলে ঐ দশরথের কাছেই যেতে চাই।
- তাহলে ইতিহাসে বিশেষ আগ্রহ নেই বলছ?
- নাহ।
- তবে তাই হোক। তথাস্তু।
আমি তো পুরো হতবাক।
-এটা কি হল?
- কেন? কি হল?
- যে লোকটা রামায়ণ লিখবে, সে লোকটা গুপ্তচর হয়ে জীবন কাটিয়ে দেবে? যে লোকটার ত্রিলোকের ত্রাস হওয়ার কথা ছিল সেই লোকটা শুধু কুস্তি লড়ে আনন্দ পাবে? আর যে লোকটা্র সাহস আর ভক্তির প্রতীক হওয়ার কথা সে লোকটা ফুর্তি করে বেড়াবে?
- এটা তোমার পৃথিবী নয়, এখানে এটাই সত্যি।
- আমি যদি একটা রামায়ণ এনে পড়িয়ে রত্নাকরকে উদবুদ্ধ করি?
- তাতে করে কিছুটা পরিবর্তন হবে তবে সামগ্রিক বিশাল কিছু পরিবর্তন করতে তোমায় দেওয়া হবেনা। কেন তোমাদের চিন না কোথায় যেন এক বানর রাজার গল্প আছেনা, যে নাকি দারুণ দুর্বিনীত ছিল, শোনা যায় নারী সঙ্গেও নাকি আগ্রহ ছিল।
- তাহলে, রামের বনবাসের কি হবে?
- একটু বাস্তবমুখী হও হে। গল্প লিখতে পারা যাবে এমন জিনিস জানাই ভাল। ওদিকটা বাদ দাও। তারপর তোমার বাজার আছে...
আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই হাতে চাপ পড়ল আর আমি সেঁদিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই উঠলাম।
- আজকের মত চলি হে।
- কিন্তু এসব কি? আমাকে দেখালেন কেন?
- আরে বাবা, রসিকতা কি শুধু তোমরা করতে পারো, ভগবান কি একটু করতে পারেন না?
এর আর আমি কি উত্তর দেব? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি মাত্র পাঁচ মিনিট হয়েছে। ঘুমাই যে নি তার স্পষ্ট প্রমাণ আবার চেয়ারটা বেশ গরম রয়েছে। খালি আক্ষেপটা হল মল্ল যুদ্ধে কি ফল হল সেটা চাক্ষুষ করতে পারলাম না!

Friday, December 28, 2018

বিধিগত সতর্কীকরণ এবং যৎকিঞ্চিত...



কাল মেট্রোতে আগুন লেগে গেছিল।
আমি আমার বাইকটা বিক্রি করে দিয়েছি।
আপাত ভাবে উপরের লাইন দুটোর মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু উহারা গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কাল একটা রাসবিহারী আসার বাস, দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে নামিয়ে দিল, সামনে আর যাওয়া যাচ্ছেনা। রাসবিহারী অবধি এসে দেখলাম, বাসে যাওয়ার মত জায়গা নেই, মেট্রো অনির্দিষ্ট, অটো হেককারি দেখাচ্ছে। আমি দুবার ফুচকা খাওয়ার চেষ্টা করে দেখলাম, মোটা মহিলারা তাদের রোগা বরদের দাঁড় করিয়ে রেখে নিজেদের জন্য নুন, টক, গন্ধরাজের অনুপান নির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন। পরেরবার সেই বরদের ফুচকা কতটা পানসে হলে ফুচকা শুধু মহিলারাই খেতে পারেন এ বোধটা যাতে পাকা হয় তারা তার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন। আমি হাঁটা লাগলাম।
চারুমার্কেটে এসে পিপিনের সামনে একটু চাউমিন আর 'বুড়ো'র সাথে দেখা। তারপরেই এ বছরের আমার সেরা ঘটনার সাথে সাক্ষাৎ। পিপিনের কাছেই বুড়োর একটা দোকান আছে, বাঙালীরা বলে ট্যাটু পার্লার, তার পাল্লায় এ বছরের সেরা ঘটনা আমার সামনে মূর্তমান হল।
দরজায় লেখা ছিল, " NO STUPID PEOPLE BEYOND THIS POINT".
আমি দেখে হেবী আনন্দ পেয়েছি তার কারণ, কোথাও তো এই সিরিয়াল খোর, বাজার বিলাসী, বাজে সিনেমা প্রেমী বাঙালী তথা ম্যাঙ্গো পিপলের মুখে কেউ জুতোর বাড়িটা মারল। বুঝল কিনা প্রশ্ন করবেন না।
পাবলিক সেয়ানা মদন, জিরো যেই শুনল ঝুলে গেছে, অমনি রসগোল্লা চাটতে লেগেছে, যদি না হত, কেউ যেত! আমি আগের সপ্তাহে একটা গান শুনে একটা লেখা লিখেছিলাম। সেটা শাহরুখ খানের সম্মন্ধে ছিল, জিরো সিনেমা নিয়ে নয়। শুধু লেখার শেষে একজন ভদ্রলোকের আর একজনের প্রতি যা করণীয় তাই করেছি। জিরোর ভাল হোক কামনা করেছি। এবার সবাই দেখছি মনে মনে ভাবছে, দেখেছিস ক্যামন জিরোটা ফ্লপ করল, সায়কের তো পুটকি জ্যাম তাহলে, কোঁত পেরেও বেরোচ্ছে না। এরকম হয়নি, আমার সকালে বিড়িও লাগেনা এমনি হয় (ভগবানের আশীর্বাদে। কেউ নজর দেবেন না)।
বুড়োর দোকানে নির্বোধেরা ঢোকে কিনা, ঢুকলে নিজেদের বুদ্ধিহীন কোটায় ছাড় চায় কিনা, সে ছাড় বুড়ো দেয় কিনা ইত্যাদি জানা হয়নি। বুদ্ধি কি? বুদ্ধি থাকলে কি হয়? ইত্যাদি প্রশ্ন ইদানীং সিলেবাসের বাইরে, প্রশ্ন করলেই ভুল প্রশ্নের দায়ে লোকে ফুল নম্বর পেয়ে যাচ্ছে।
শেষে একটা প্রাপ্তি যোগও হল আমার, সেসব দেব ভোগ্য জিনিস, সবুজ রঙের হালকা ভেজা ভেজা গঞ্জিকা। খাবার পর বাইকে চড়ে আমি ফুল 'সিংহম'। তাই ঠিক করেছি আমি সিম্বা দেখতে যাব।
বুড়ো, সম্ভবত অগাধ বিশ্বাসে আমাকে ওর দোকানে ঢুকিয়েছিল, আমি সেই নির্দিষ্ট বিন্দু অতিক্রম করতে পারি। এবার আপনারা ভাবুন।

Thursday, September 27, 2018

মন খারাপের রাতে


এক দিন সকালে উঠে পেঁজা মেঘেদের ভেসে যেতে দেখেও আনন্দের মন কেমন করে। সুখ আর দুঃখ যমজ ভাইয়ের মত। এই হয়ত একটা বই তুলে গন্ধ নিলুম, মনটা দারুন ভাল হয়ে গেল, দু পাতা পড়ে মনে হল আমি কেন অমুক হলাম না, আমি কেন সুর বুঝিনা, আমি তো এলিয়টের সাথে ভেজা বিকেল কাটাইনি, আমি সংস্কৃত টা শিখতে পারিনি, ব্যস মনখারাপ।
এগুলো অনেক স্থূল কারণ মশাই, এগুলো আসা যাওয়া করে, কিছু কারণ আবার গেড়ে বসে থাকে যেতে চায়না মোটে। যেমন ধরুন এক রাতে ফেসবুকে ভাবলাম কোনো এক সুন্দরীকে কবিতা শোনাবো (আমার নিজেকে এভাবেই উদ্বুদ্ধ করতে হয়), কিন্তু সে এলোনা, মানে কবিতা। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে টুকি দিতে থাকল, এরকম সময় বেবাক মন খারাপ হয়।
এরকম মাঝে মাঝে হয় আমার, কখনও সামলে নিই আর খুব ঝামেলা হলে ঘুমিয়ে পড়ি। এই দেখুন না একটা রূপকথার উপন্যাস লিখব বলে খুব হেঁইও বলে লেগেছি। ভেবে রেখেছি নায়কের একটা প্রেম হবে, ছোটদের মত নয় বড়দের মত। এযাবৎ রূপকথায় যা বলা যেত বলে আমি মনে করেছি কিন্তু যা বলা হয়নি তা আমি বলব থুড়ি লিখব ভেবেছি। 
ঐ অবধিই। রোজ রাতে বসি ল্যাপটপে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের সাদা পাতা সাদাই থাকে। এ এক অদ্ভুত অবস্থা।
সেদিনও ঐ একই অবস্থায় ছিলাম, ঘুম আসব আসব করছিল, লেখা আসছিল না, হঠাৎ শুনলাম একটা অদ্ভুত গলা বলে উঠল, "তা দাওনা হে শঙ্খমালার সাথে লালকমল এর বিয়েটা দিয়ে দাওনা"। গলাটা অঞ্জন দত্তের গলার সাথে একটা স্যাক্সোফোনের আওয়াজ মিশেল দিলে যা হয় তাই। অবাক কাকে বলে! যে প্রাণীটা দেখলাম তার বিবরণে পরে আসছি। সানাইয়ের সুরের সাথে যদি লাবণী সরকারের গলা মিক্সিতে ঘন্ট পাকিয়ে দেওয়া হয় তাহলে যা দাঁড়াবে, সেই গলার এক মহিলা স্বর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, "কেন কেন, লালকমল কেন? নীলুর সাথে শঙ্খর বিয়ে হবে"। 
-
যা বোঝনা তা নিয়ে কথা বলোনা ব্যাঙ্গমী, নীলু ওরকম একটা স্টাড, ওর সাথে যাবে হল কাঞ্চনমালা।
চোখের সামনে, শ্রাবন্তী আর কল্পনার সুপ্রিয়াদেবী ভেসে উঠলেন। চোখ ফেরাতেই দেখি লোকটা প্রায় নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বলছে, "সিনেমাটা তো হলনা। এবার এটা কর, যদি পার। প্রায় তিন খানা কম্পাঙ্কের স্তর পেরিয়ে আসতে হয়েছে আমাদের। যথেষ্ট বয়স হয়েছে আমাদের, আর আমরাই শেষ লটের শেষ কাপল এর পরে আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী ম্যানুফ্যাকচারর্ড হয়নি"।
    ভাবছিলাম বলি, তা আপনারা যদি একটু চেষ্টা চরিত্তির করতেন তাহলে কি এক আধটা... ভাবনা পুরো শেষ করার আগে একটা অন্য গলা পেলাম, - "নিজের কথা গুলোই বলে যাবে? আমিও অনেক দূর থেকে এসেছি"- কাঁসরে যদি ফাঁপা কাঠি দিয়ে মারা হয় তাহলে যে শব্দ বেরোয় তার সাথে কৌশিক গাঙ্গুলীর গলা মেশাতে হবে। সে বলল, “আমি নিজেই পরিচয় দিচ্ছি। আমি হলুম ভূশণ্ডী, আদি বায়স কুলচূড়োমণি, দন্ডবায়স”।
- “
হু:, দাঁড় কাক! আরে বাবা পাখি হিসাবে তুমি আমার নখের যুগ্যিও নও”। ব্যাঙ্গমা একটা বিকৃত মুখ করে ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল।
-“কিন্তু ঐ ব্যাপারটা শুধু বাদ দিলে, ঐতিহাসিক বল, কিংবদন্তি বল, সাহিত্য মর্যাদা বল, আমি কম নই, বরং আমার রেঞ্জটা একটু বেশি”, ভুশন্ডীর মিচকে জবাব।
একটু দমে গিয়ে ব্যাঙ্গমা বলল, - “সে দক্ষিণারঞ্জন ছাড়া আর কেউ সাহস করল না, ত্রৈলোক্যবাবুও চাইলে পারতেন কিন্তু করলেন না...”
-
তাই এই ছেলেটাকে ধরলে?
-
আরে বাবা, একটা জিনিস তো বুঝতে হবে আমি কিছু করিনি ও নিজেই চেয়েছে, নাহলে এমনি এমনি...
-কে জানে বাবা এমন কুচুটে লোকের এখানে কি দরকার কে জানে, কথা হচ্ছিল শঙ্খমালা নিয়ে...”, গজগজ করতে করতে ফুট কাটল ব্যাঙ্গমী।
    এতে দেখলাম একটু চোখ পিটপিট করে ভুশন্ডী খানিকক্ষণ থমকে গেল, যেন একথার উত্তর আর সে দিতে পারবেনা, তারপর একটু সাম্লে নিয়ে বলল, “ও যেটা বলতে আসা এখানে। আসার পথে দেখলুম কঙ্কাবতী বনের পথে আসছে, তা বলছিলাম এমনি সে ডাগর হয়েছে, তারপর তোমরা যখন নীলকমল এর জন্য পাত্রী খুঁজছ...”
“না, না” করে ব্যাঙ্গমা এক চিৎকার করে উঠল, “আরে বাবা টাইম আর স্পেস নিয়ে মশকরা করিসনা, ভুশন্ডী, গোটা প্লটটার একটা জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যাবে”।
-“কেন এরকম কি হয়না?” –একটা মিহি গলা যেন ফুট কাটল পাশ থেকে। একটা নেড়া মাথা, গলাবন্ধ জরির পাঞ্জাবী আর চোস্ত পরা একটা লোক, মুখে একরাশ লজ্জা মেশানো ভাব আর হাতে কিছু কাগজ নিয়ে লোকটা বলল, “আমি তো হামেশাই এরকম মিল দেখতে পাচ্ছি। এই ধর খুঁজছিলাম একটা লালমুখো হুমদো বেড়াল কে, হঠাৎ এখানে এসে হাজির হলাম। তা একটা কবিতা শুনবে, কবিতা...”, বলে কারুর তোয়াক্কা না করে একটা পাকানো কাগজ খুলে পড়তে আরম্ভ করে দিল,
“লাল গাছে নীল ফুল
 সোঁদা সোঁদা গন্ধ,
 কি যে হয়, কোথা যাই
 মনে লাগে ধন্ধ...
তারপর...তারপর...” বলে সে খুব খুঁজতে লাগল কাগজটায় তারপর কিছু খুঁজে না পেয়ে একটা বোকার মত হেসে বলল, “আজকাল চার লাইন করে লিখছি”। কথাটা বলে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাতে লাগল, কবিতার প্রশংসা পাওয়ার আশায়।
ব্যাঙ্গমা প্রচণ্ড এক ভুরু কুঁচকে ভূশন্ডীকে বলল, “কাকেশ্বর, তুমি আবার এদের ঢোকালে?”।
ব্যাঙ্গমী সঙ্গে সঙ্গে নাকি কেঁদে বলে, “তাহলে আমাদের নীলুটার কি হবে গো, রাক্ষসী রানী যদি ওকে কাঠালের বিচি বানিয়ে রাখে?”
-“আঃ মেলা বকোনা তো এখন, দেখতে পাচ্ছ ইনসেপশন হচ্ছে”, বলেই আবার ভূশন্ডীকে বলল,  কি, কী হল কাকেশ্বর?
ভূশন্ডী দেখলাম তাতে খুব মুখভার করে বলল, “না না, খুড়ো, ওই নামে এখন আর আমায় ডাকলে চলবে না। আমি আর ঐ হিসাবের ব্যবসা করিও না আর হিসেব রাখিও না। এখন আমি যাকে বাংলায় বলে, স্পিরিচুয়াল মোটিভেটর”।
-ইল্লি আরকি! তা পাখিদের আর কাজ কি, টপ ভিউটা কি এমনি এমনি দিয়েছে? আর তাছাড়া গরুর আর জটায়ু ছাড়া কোন পাখীকে তুমি অ্যাকশন করতে শুনেছ শুনি?
দুজনের কথা চলছিল, হঠাৎ মাঝখানে সেই সরু গলা ব্যাঙ্গমী কে বলল, “তা বলছিলাম কি, আপনি আমার একটা কবিতা শুনবেন?”।
ব্যাঙ্গমী তো একলাফ দিয়ে উঠে বলল, “আ মোলো যা! কি অলক্ষুণে কথা বলে শোনো”
-“আহা, একবার শুনেই দেখুন না, কতদিন কেউ ভুল করে আসে না এদিকে, আর ব্যাকরণ শিং ও একেবারে বেপাত্তা। এটা একেবারে নতুন...
 ‘চেপেচুপে একখানা আঁক কষ মাথাতে,
 কে বা বড় সিংগি না গজরাজ বনেতে?
 হিসাব নিকাশ যদি মিলে যায় মনেতে
 কি আর করা যাবে তালি মারো দু-হাতে’,”।
বলে নিজেই একেবারে খুব আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠল।
ব্যাঙ্গমা আরো ক্ষেপে গেল, “কাকেশ্বর, এটা কি হচ্ছে?”
কাকেশ্বরের অম্লান বদনে জবাব, “কি আর হবে? হিজিবিজবিজ এর ইচ্ছা থাকলেও কিছু হবে না, যদিও আইন বেরিয়ে গেছে, আর আপনিও কিস্যু করতে পারবেন না। তবে আর একবার ও নামে ডাকলে কিন্তু লোক লেলিয়ে দেব বলে রাখছি।
আমাকে আইনের ভয় দেখাচ্ছিস? জানিস আমার ডিরেক্ট ব্লাড লাইনে কার কার নাম আছে? আর লোকের ভয় দেখাচ্ছিস? জানিস একটা ফোন করলে নীলু চলে আসবে তারপর রক্তগঙ্গা বইবে”।
কাকেশ্বর ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল, “সে যার রক্তে যা থাকে থাকুক কিন্তু ও নামে ডাকলে আমি মোটেই খেলব না”।
-   “কাকেশ্বর! কাকেশ্বর! কাকেশ্বর!”
-   “উবু! একষট্টি, বাষট্টি, তেষট্টি...”
কাকেশ্বর এরকম বলতে বলতেই দুটো টেকো লোক মাটি ফুঁড়ে যেন উদয় হল।
প্রায় একরকম দেখতে লোকদুটোকে কার্টুনের মত, লম্বা দাঁড়ি হাঁটু অবধি ছুঁয়েছে, একজনের কপালের পরেই একগাছি বেগুনী চুল আর একজনের সেটাও নেই, বোজার সুবিধের জন্য বোধহয়। দুজনেরই পড়নে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি।
একদম টেকোটা বলল, কতবার না বলেছি, দুপুরবেলা অঙ্ক কষতে ডাকবে না, পান্তাভাতে পিঁয়াজ মেখে খেয়ে আমরা দুজন ঘুমোই।
কাকেশ্বর অপ্রস্তুত হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “কতবার বলেছি সে ব্যবসা আর করিনা আমরা, বুধো, গাঁট্টা মার উধোটাকে”।
যাকে বুধো বলে ডাকা হল, সে বলল, “সে তুমি যাই বল, এখনও তিন টাকা চোদ্দ আনা ছয় নয়া পয়সার হিসাব বাকী আছে, সেটা না দিলে কাজ করব না”।
বেগতিক দেখে কাকেশ্বর গলা নামিয়ে বলল, “আরে দেবো দেবো খাতায় সব লেখা আছে না। কিন্তু এ লোকটা যে তোদের টেকো বলল সেটার কি হবে?”
একথা শুনেই দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে, “আমাদের টেকো বলেছে রে!” বলে সুর করে ডেকে উঠল, তারপর রাগে মাটিতে পা ঘষতে লাগল।
এদিকে ব্যাঙ্গমা ঘাবড়ে গিয়ে, “এই মারবি নাকি? এই... নীলকমল এসে পড়বে কিন্তু...খবরদার বলছি...”, এসব বলতে লাগল। আর ব্যাঙ্গমী, “আমার কি হবে গো”, বলে কাঁদতে আরম্ভ করেছে। হিজিবিজবিজ এসব দেখে, “আমার কি হাসি পাচ্ছে গো”, বলে গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। কাকেশ্বর শুধু, “লেগে যা, নারদ নারদ”, বলতেই, উধো আর বুধো তেড়ে গেল।
মাথাটা ল্যাপটপের উপর ঠোকা লেগে যেতেই, তাকিয়ে দেখলাম সাদা ওয়ার্ডের পাতায় দু লাইন লেখা আছে-
“হিং টিং ছট,
 কাগের বাসায় বগের ডিম,
 তোড়ায় বাঁধা, ঘোড়ার ডিম”।

কুলের আচার ও পুরাতনী চিঠি

 মনে করুন, এভাবেই সময় চলছে... তাতে তো আর জীবন কাকু থেমে থাকবে না। এগিয়েই যাবে। মনে করুন এরকম ভাবেই ২০২৫ এর বসন্ত এসে গেছে, এভাবেই ঘরে বসে কা...